জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলূম মাদানিয়া, বিশ্বনাথ। Jamia Islamia Darul Uloom Madania Bishwanath, sylhet.
ভূমিকা
বাংলাদেশের সিলেট জেলার বিশ্বনাথ থানা ইসলামী শিক্ষা ও তাওহীদের দাওয়াতের এক উজ্জ্বল কেন্দ্র। এই অঞ্চলে বিশ শতকের মাঝামাঝি যে শিক্ষা-জাগরণ আন্দোলনের সূত্রপাত হয়, তার কেন্দ্রস্থলে দাঁড়িয়ে আছেন এক নিবেদিতপ্রাণ আলেম — আল্লামা আশরাফ আলী বিশ্বনাথী রহ. (১৯২৮–২০০৫)। তাঁর হাতে প্রতিষ্ঠিত জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলূম মাদানিয়া, বিশ্বনাথ কেবল একটি মাদরাসা নয়; এটি ছিল এক আধ্যাত্মিক ও সামাজিক পুনর্জাগরণের সূতিকাগার, যা মৃতপ্রায় এক অঞ্চলে আলোর স্ফুলিঙ্গ জ্বালিয়ে দেয়।
প্রতিষ্ঠার পূর্বপ্রেক্ষাপট ও নবযাত্রা (১৯৫৯)
পঞ্চাশের দশকের শেষভাগে (প্রায় ১৯৫৮–৫৯) আশরাফ আলী বিশ্বনাথী রহ. তখন বালাগঞ্জ উপজেলার পারকুল মাদরাসায় শিক্ষকতা করছিলেন। সেই সময় বিশ্বনাথের একটি স্থানীয় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, বিশ্বনাথ এম.ই. মাদরাসা বন্ধ হয়ে যায়। এলাকার মুরুব্বি ও উলামায়ে কেরামরা তাঁর মধ্যে সম্ভাবনার আলো দেখে মাদরাসার হাল ধরার জন্য তাঁকে আহ্বান করেন। তিনি প্রতিকূল পরিস্থিতি সত্ত্বেও দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং নতুনভাবে প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন।
১৯৫৯ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে মাদরাসাটি পুনর্জন্ম লাভ করে এবং বিশ্বনাথ দারুল উলূম আলিয়া মাদরাসা নামে তার নবযাত্রা শুরু হয়। আশরাফ আলী বিশ্বনাথী রহ.-এর তাওয়াক্কুল (আল্লাহর উপর ভরসা) ও কঠোর পরিশ্রমের শক্তিতে মৃতপ্রায় এই প্রতিষ্ঠানে ফিরে আসে প্রাণ।
ঐতিহাসিক স্থানান্তর: বাসিয়া নদীর উত্তর পাড় (১৯৬১)
মাত্র দুই বছরের মধ্যে আল্লামা বিশ্বনাথী রহ. উপলব্ধি করেন, মাদরাসার বৃহত্তর পরিসর প্রয়োজন। ১৯৬১ সালে তিনি সাহসিকতার সঙ্গে মাদরাসাটি বাসিয়া নদীর উত্তর তীরে স্থানান্তর করেন। এই পদক্ষেপ বিশ্বনাথের ইতিহাসে এক মোড় ঘুরিয়ে দেয়। যে স্থান একসময় জনশূন্য ছিল, সেখানে মাদরাসাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে বসতি, দোকানপাট, ও বাজার। এভাবেই জন্ম নেয় আজকের বিশ্বনাথ উত্তর বাজার।
নতুন স্থানে মাদরাসাটি শুরু হয়েছিল সম্পূর্ণ শূন্য থেকে। শায়খে আশরাফ আলী বিশ্বনাথী রহ. এর পুঁজি ছিল কেবল আল্লাহর উপর দৃঢ় তাওয়াক্কুল। সেই সময় স্থানীয় সমাজের কিছু নিবেদিতপ্রাণ মানুষ তাঁর পাশে দাঁড়ান, যাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন: মাওলানা খুরশিদ আলী (শাহজিরগাঁও), হাজী আছমত আলী (চান্দশিরকাপন), হাজী তবারক আলী (রাজনগর), হাজী আকরাম উল্লাহ (কারিকোনা), হাজী তুতা মিয়া (জানাইয়া), মাওলানা আবদুল মুছাব্বির (পারকুল), মাস্টার আলতাফুর রহমান (কাশিমপুর), কারী আহমদ আলী (দুর্যাকাপন), হাজী মুছলিম আলী ও হাফিয মুকাররম আলী প্রমুখ।
নাম পরিবর্তন ও ‘মাদানিয়া’ যুগের সূচনা (১৯৭৪)
১৯৭৪ সালে ভারতবর্ষের খ্যাতনামা আলেম ফেদায়ে মিল্লাত আল্লামা আসআদ মাদানী (রহ.) মাদরাসাটি সফর করেন। তাঁর প্রস্তাবে মাদরাসার নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় “দারুল উলূম মাদানিয়া কওমিয়া মাদরাসা, বিশ্বনাথ।” এ সময় ‘আলিয়া’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়, যা কওমি শিক্ষা ধারার স্বাতন্ত্র্যকে দৃঢ়ভাবে প্রকাশ করে।
দাওরায়ে হাদীস ও ‘জামিয়া’ মর্যাদা লাভ (১৯৮৩)
আশরাফ আলী বিশ্বনাথী রহ.-এর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, একদিন এই মাদরাসায় সিহাহ সিত্তার দারস (বুখারী, মুসলিম, তিরমিজি ইত্যাদি) চালু হবে। তিনি একবার স্বপ্নে দেখেন—শায়খুল আরব ওয়াল আজম সায়্যিদ হুসাইন আহমদ মাদানী রহ. এসে বলছেন,
“ময় য়েহ্ বিহি পড়হাতা হোঁ আওর ওহ বিহি পড়হাতা হো।”
(অর্থাৎ আমি এই কিতাবও পড়াই, সেই কিতাবও — যার অর্থ বুখারী শরীফ)।
তাঁর এই বিশ্বাস বাস্তবরূপ লাভ করে ১৯৮৩ সালের ১০ আগস্ট (বুধবার)। বিশ্বনাথের আকাশে হাদীসের সুবাস ছড়িয়ে দিতে জামিয়া মাদানিয়ার জামে মসজিদে অনুষ্ঠিত হয় বুখারী শরীফের প্রথম দারস।
নসিহত প্রদান করেন শায়খে কৌড়িয়া রহ. এবং প্রথম দারস প্রদান করেন আল্লামা রিয়াসত আলী শায়খে চখরিয়া রহ.। এই দিন থেকেই প্রতিষ্ঠানটি আনুষ্ঠানিকভাবে “জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলূম মাদানিয়া” নামে খ্যাতি পায়, যা সর্বোচ্চ স্তরের ইসলামী শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।
বিস্তার, মহিলা শাখা ও সাংগঠনিক প্রভাব
শিক্ষাবিস্তারের পাশাপাশি শায়খে বিশ্বনাথী রহ. নারী শিক্ষার ক্ষেত্রেও উদ্যোগী হন। আশির দশকে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন জামিয়া মাদানিয়া কওমিয়া মহিলা মাদরাসা, বিশ্বনাথ, যা আজও সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে। তিনি আমৃত্যু এই দুই প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন।
উপসংহার ও উত্তরাধিকার
২০০৫ সালের ২০ মে, শুক্রবার, আল্লামা আশরাফ আলী বিশ্বনাথী রহ. ইন্তেকাল করেন। তবে তাঁর প্রতিষ্ঠিত জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলূম মাদানিয়া, বিশ্বনাথ, আজও সিলেটের বিশ্বনাথ অঞ্চলের ইসলামী শিক্ষার এক বিশাল কেন্দ্র হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। এটি শুধু একটি মাদরাসার ইতিহাস নয়—এটি একজন আলেমের নিষ্ঠা, তাওয়াক্কুল ও সমাজ পরিবর্তনের প্রতিচ্ছবি। আল্লামা আশরাফ আলী বিশ্বনাথী (রহ.) দেখিয়ে গেছেন যে, দ্বীনের কাজ দৃঢ় ইচ্ছা ও মেহনত ছাড়া টিকে থাকে না। বাসিয়া নদীর তীরে তাঁর স্বপ্নের এই প্রতিষ্ঠান আজ এক জীবন্ত ইতিহাস, যেখানে শিক্ষার আলোয় আলোকিত হচ্ছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম।
