Jamia Qasimul uloom Dargahe Hazrat Shahjalal (rh) Madrasa Sylhet. দরগাহ মাদ্রাসা সিলেট।
সিলেটের ইসলামী ঐতিহ্যের ধারক: জামেয়া কাসিমুল উলুম দরগাহে হযরত শাহজালাল (রহ.)
সিলেট শহর তার আধ্যাত্মিক ও ধর্মীয় পরিচিতির জন্য সুপ্রসিদ্ধ, আর এই পরিচিতির অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হলো হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর পবিত্র মাজার প্রাঙ্গণ। এই পবিত্র ভূমিতেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে সিলেটের প্রাচীন, ঐতিহ্যবাহী ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কওমি মাদ্রাসা— জামেয়া কাসিমুল উলুম দরগাহে হযরত শাহজালাল (রহ.), যা স্থানীয়দের কাছে দরগাহ মাদ্রাসা নামেই সমধিক পরিচিত। প্রতিষ্ঠানটি কেবল একটি শিক্ষাকেন্দ্র নয়, বরং এটি সিলেটের ইসলামী ঐতিহ্যের এক শক্তিশালী ধারক ও বাহক।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও প্রতিষ্ঠা
এই মহৎ দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের শুভ সূচনা হয় ১৯৬১ সালের ৭ নভেম্বর (১৩৮১ হিজরী, ২৭ জুমাদাল উল আখির)। জামেয়া কাসিমুল উলুমের স্বপ্নদ্রষ্টা ও প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন আল্লাহর প্রিয়জন আরিফ বিল্লাহ হাফিজ মাওলানা আকবর আলী রহ.। এই মহতী উদ্যোগের পেছনে প্রধান প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছিল উপমহাদেশের প্রখ্যাত ইসলামি ব্যক্তিত্ব মুফতি মুহাম্মদ শফী রহ.-এর আন্তরিক ইচ্ছা ও নির্দেশনা।
প্রতিষ্ঠার সময় মাজার দায়িত্বশীল এ. জেড. আবদুল্লাহ চৌধুরী এবং সিলেট আলিয়া মাদরাসার শিক্ষকমণ্ডলী ভূমি দান ও সর্বাত্মক সহায়তা করে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। প্রথমদিকে এর নাম ছিল ‘মাদ্রাসায়ে তা’লিমুল কুরআন’, কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় ও প্রতিষ্ঠানের শিক্ষাগত বিস্তৃতির সঙ্গে সঙ্গে এটি বর্তমান নাম ধারণ করে। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এই প্রতিষ্ঠানটি উপমহাদেশের অন্যতম প্রধান বিদ্যাপীঠ দারুল উলুম দেওবন্দের মূলনীতি ও শিক্ষাপদ্ধতিকে নিবিড়ভাবে অনুসরণ করে আসছে, যা এর মান ও স্বীকৃতির ভিত্তি স্থাপন করে।
শিক্ষা কার্যক্রমের বিস্তৃত পরিসর
জামেয়া কাসিমুল উলুমের শিক্ষা ব্যবস্থা অত্যন্ত সুসংগঠিত এবং কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্তরে বিভক্ত, যা ছাত্রদের প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চতর গবেষণামূলক জ্ঞান পর্যন্ত পৌঁছে দেয়:
১. মারহালায়ে ইবতেদাইয়্যাহ (প্রাথমিক)
২. মারহালায়ে মুতাওয়াসসিতাহ (নিম্ন মাধ্যমিক
৩. মারহালায়ে ফযীলত (স্নাতক)
৪. মারহালায়ে তাকমীল (স্নাতকোত্তর / টাইটেল ক্লাস): এটি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ স্তর, যেখানে হাদীস-গ্রন্থসমূহ (সিহাহ সিত্তা) এবং উচ্চতর গবেষণামূলক বিষয়াদি পাঠদান করা হয়।
এই মূল বিভাগগুলোর পাশাপাশি, প্রতিষ্ঠানে হিফজ বিভাগ, ফিকাহ ও ইসলামি বিচার-পদ্ধতির উপর বিশেষায়িত তাখাসসুস ফিল ফিকাহ ওয়াল ইফতা এবং শিশুদের জন্য প্রাতঃকালীন মক্তব চালু রয়েছে।
বর্তমান বৈশিষ্ট্য ও ব্যবস্থাপনা
প্রতিষ্ঠানের মুহতামিম (পরিচালক) হিসেবে বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন মাশুক উদ্দীন। প্রায় ৩৫ জন শিক্ষক এবং ২০ জন কর্মচারী এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষাদান ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনায় নিয়োজিত। শিক্ষায় কঠোর নিয়মানুবর্তিতার কারণে জামেয়া কাসিমুল উলুম দরগাহ মাদ্রাসা ‘ওলি-আউলিয়া তৈরির কারখানা’ হিসেবে বিশেষ খ্যাতি লাভ করেছে। বর্তমানে এখানে প্রায় সাড়ে ১০৭০ জনের বেশি ছাত্র আবাসিক ছাত্রাবাসে অবস্থান করে দ্বীনি শিক্ষা গ্রহণ করছে। ছাত্রদের জ্ঞানার্জনের সুবিধার্থে প্রতিষ্ঠানের গ্রন্থাগারে ১৫,০০০-এরও বেশি কিতাব সংরক্ষিত আছে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মাদ্রাসাটির কোনো স্থায়ী আয়ের উৎস নেই; এটি সম্পূর্ণরূপে দান-খয়রাত ও জনসাধারণের স্বতঃস্ফূর্ত অবদানে পরিচালিত হয়।
ভবিষ্যৎ শিক্ষাবিস্তারের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানটি পৃথক ক্বিরআত ও তাজবীদ বিভাগ, তাখাসসুস ফিল হাদীস ও উলূমুল কোরআন বিভাগ চালুর পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।
হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর পবিত্র মাজার সংলগ্ন কৌশলগত অবস্থানে থাকার কারণে জামেয়া কাসিমুল উলুম দরগাহ মাদ্রাসা সিলেটবাসীর জন্য একটি নির্ভরযোগ্য ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে চলেছে।
ঠিকানা: দরগাহ মসজিদ প্রাঙ্গণ, সিলেট শহর, বাংলাদেশ।
