জামিয়া ইসলামিয়া মাদরাসাতুল উলুম দারুল হাদীস হরিপুর বাজার

জামিয়া ইসলামিয়া মাদরাসাতুল উলুম দারুল হাদীস হরিপুর বাজার
District: Sylhet
Upazila: Kanaighat

সিলেটের আধ্যাত্মিক বাতিঘর: জামিয়া ইসলামিয়া মাদরাসাতুল উলুম দারুল হাদীস হরিপুর বাজার

সিলেটের পুণ্যভূমি, আধ্যাত্মিকতার উর্বর প্রান্তর—যেখানে ওলী-আউলিয়াদের পদচারণায় ধন্য হয়েছে প্রতিটি জনপদ। এই আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক হিসেবে সিলেট শহর থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার উত্তরে, জৈন্তাপুর উপজেলার ঐতিহাসিক হরিপুর বাজারের সন্নিকটে সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে এক দ্বীনি বাতিঘর— ‘জামিয়া ইসলামিয়া মাদরাসাতুল উলুম দারুল হাদীস হরিপুর বাজার’। স্থানীয়ভাবে ‘হরিপুর বাজার মাদ্রাসা’ নামে সমধিক পরিচিত। এই মাদরাসাটি বিগত চার দশকেরও বেশি সময় ধরে সিলেট অঞ্চলসহ গোটা বিশ্বে কুরআন-সুন্নাহর আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে।

ইসলামি শিক্ষা, তাহযীব-তামাদ্দুন এবং আধ্যাত্মিক চেতনার উন্মেষ ঘটানোর লক্ষে ৩ নভেম্বর ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দ (২৩ জিলহজ্জ১৪০০ হিজরী) সালে যাত্রা শুরু করে জামিয়া ইসলামিয়া মাদরাসাতুল উলুম দারুল হাদীস। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই এটি কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, বরং অত্র অঞ্চলের মানুষের ঈমান ও আকিদা রক্ষার এক দুর্ভেদ্য দুর্গ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

প্রতিষ্ঠার ইতিহাস ও স্বপ্নদ্রষ্টা
এই মহৎ প্রতিষ্ঠানের গোড়াপত্তন হয় ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ, মুজাহিদে মিল্লাত, খতীবে মিল্লাত আল্লামা শায়খ আব্দুল্লাহ হরিপুরী (রাহ.)-এর হাত ধরে। তিনি ছিলেন একাধারে প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন, হাদিস বিশারদ এবং লক্ষ মানুষের আধ্যাত্মিক রাহবার। তৎকালীন সময়ে জৈন্তাপুর ও এর আশপাশের জনপদকে নিরক্ষরতা ও কুসংস্কারের অন্ধকার থেকে মুক্ত করে দ্বীনের সঠিক বুঝ ও শিক্ষায় আলোকিত করার মহান ব্রত নিয়ে তিনি এই মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন।

প্রতিষ্ঠার সূচনাগ্নে খতীবে মিল্লাত আল্লামা শায়খ আব্দুল্লাহ হরিপুরী (রাহ.) নিজেই মাদ্রাসার মুহতামিম এবং শিক্ষাসচিবের গুরুদায়িত্ব পালন করেন। তাঁর ইখলাস, ত্যাগ এবং দূরদর্শী চিন্তাধারার ফলেই আজ এই প্রতিষ্ঠানটি মহীরুহে পরিণত হয়েছে।

বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ
প্রতিষ্ঠাতার ইন্তেকালের পর তাঁরই রেখে যাওয়া আমানত এবং দ্বীনি মশাল বহন করে চলেছেন তাঁর সুযোগ্য সন্তান মাওলানা শায়খ হিলাল আহমদ সাহেব, যিনি বর্তমানে মাদ্রাসার মুহতামিমের দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর দক্ষ পরিচালনায় এবং প্রবীণ ও নবীন আলেমদের সমন্বয়ে মাদ্রাসাটি এগিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে শায়খুল হাদীস হিসেবে হাদিসের দরস দিচ্ছেন আল্লামা শায়খ আব্দুল কাদির বাগেরখালী এবং শিক্ষাসচিব হিসেবে গুরুদায়িত্ব পালন করছেন মাওলানা নজরুল ইসলাম তোয়াকুলী।

শিক্ষা কার্যক্রম ও বৈচিত্র্য
জামিয়া ইসলামিয়া হরিপুর বাজার মাদ্রাসাটি সুশৃঙ্খল শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য সর্বমহলে প্রশংসিত। এখানে একদম শিশু শ্রেণি থেকে শুরু করে ইসলামি শিক্ষার সর্বোচ্চ স্তর ‘দাওরায়ে হাদীস’ (মাস্টার্স সমমান) পর্যন্ত পাঠদান করা হয়। মাদ্রাসার শিক্ষা স্তরগুলো নিম্নরূপ:

  • নূরানী বিভাগ

  • হিফয বিভাগ
  • ইবতেদায়ী

  • মুতাওয়াসসিতাহ 

  • আলিয়া 

  • তাকমীল ফিল হাদীস বা দাওরায়ে হাদীস (মাস্টার্স)।

নারী শিক্ষার অনন্য দৃষ্টান্ত: হরিপুর বাজার মাদরাসা কেবল পুরুষদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। নারী শিক্ষা ও ক্ষমতায়নের লক্ষে এখানে নারীদের জন্য স্বতন্ত্র ব্যবস্থাপনায় প্রথম শ্রেণি থেকে দাওরায়ে হাদীস (টাইটেল) পর্যন্ত শিক্ষার সুব্যবস্থা রয়েছে, যা অত্র অঞ্চলে নারী শিক্ষার প্রসারে এক বৈপ্লবিক ভূমিকা পালন করছে।

বর্তমানে ৪৩ জন অভিজ্ঞ ও নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক-শিক্ষিকার তত্ত্বাবধানে প্রায় ১৪১২ জন ছাত্র-ছাত্রী এখানে জ্ঞান আহরণ করছে।

কৃতিত্ব ও ফলাফল
মাদ্রাসাটি ‘পূর্ব সিলেট আযাদ দ্বীনি আরবি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড’-এর অধীনে পরিচালিত হয়। ফলাফলের দিক দিয়ে এটি বোর্ডের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান। প্রতি বছর বোর্ড পরীক্ষায় প্রায় ৬০-৭০টি মুমতাজ (স্টার মার্কস/প্রথম বিভাগ) সহ গড়ে ৯৫ শতাংশ পাসের হার প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার গুণগত মানেরই পরিচায়ক।

অবকাঠামো ও সমাজসেবা
মাদ্রাসার ভৌত অবকাঠামোর মধ্যে রয়েছে একটি সুবিশাল পুরুষ শিক্ষাভবন, একটি সুরক্ষিত মহিলা শিক্ষাভবন, একটি জামে মসজিদ এবং একটি নবনির্মিত শিক্ষাভবন।

জনসাধারণের স্বতঃস্ফূর্ত দান ও অনুদানই এই প্রতিষ্ঠানের আয়ের মূল উৎস। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সাথে পরিচালিত এই প্রতিষ্ঠানে গরিব ও অসহায় ছাত্রদের জন্য রয়েছে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা। বর্তমানে প্রায় ৩০০ জন ছাত্র আবাসিক বোর্ডিং-এ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে থাকা-খাওয়ার সুবিধা নিয়ে পড়াশোনা করছে, যা সমাজসেবার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

সামাজিক প্রভাব ও সংস্কার
প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই জামিয়া ইসলামিয়া হরিপুর বাজার মাদ্রাসা সমাজ সংস্কারে নীরব বিপ্লব ঘটিয়ে চলেছে। এই মাদ্রাসার প্রভাবে হরিপুর বাজার ও এর আশপাশের এলাকায় ইসলামি সংস্কৃতির এক সুস্থ পরিবেশ বিরাজমান। মাদ্রাসার আধ্যাত্মিক প্রভাবে হরিপুর বাজারে জনসম্মুখে টেলিভিশন চালানো হয় না এবং প্রকাশ্যে গান-বাজনা নিষিদ্ধ। এটি কেবল আইনের শাসন নয়, বরং স্থানীয় মানুষের ওপর মাদ্রাসার শ্রদ্ধাবোধ ও নৈতিক প্রভাবের ফল।

এখান থেকে শিক্ষা নিয়ে বের হওয়া শত শত আলেম, হাফেজ ও মুফতি আজ দেশ-বিদেশে দ্বীনের খেদমতে এবং সমাজের নেতৃত্ব দানে নিয়োজিত আছেন।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
জ্ঞানের পরিধিকে আরও বিস্তৃত করার লক্ষে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের রয়েছে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা। ভবিষ্যতে এখানে তাফসীর, হাদীস, ফিকহ এবং আরবি সাহিত্যের ওপর উচ্চতর গবেষণা বিভাগ (তাখাসসুস) খোলার পরিকল্পনা রয়েছে, যা এই প্রতিষ্ঠানকে একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করতে সহায়তা করবে।

জামিয়া ইসলামিয়া মাদরাসাতুল উলুম দারুল হাদীস হরিপুর বাজার কেবল ইট-পাথরের কোনো দালান নয়; এটি একটি চেতনা, একটি বিশ্বাস এবং হাজারো মানুষের পরকালীন মুক্তির স্বপ্ন। আল্লামা শায়খ আব্দুল্লাহ হরিপুরী (রাহ.) যে চারাগাছটি রোপণ করেছিলেন, তা আজ ডালপালা মেলে এক বিশাল বৃক্ষে পরিণত হয়েছে, যার ছায়াতলে হাজারো শিক্ষার্থী খুঁজে পাচ্ছে দ্বীনের আলো। আল্লাহ তায়ালা এই প্রতিষ্ঠানটিকে কবুল করুন এবং কেয়ামত পর্যন্ত এর ফয়েজ ও বরকত জারি রাখুন।

Sign In

Register

Reset Password

Please enter your username or email address, you will receive a link to create a new password via email.