জামেয়া ইসলামিয়া বুধবারী বাজার। Jamea Islamia Budhbaribaza
সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার বুকে জ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতার আলোকবর্তিকা হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে জামেয়া ইসলামিয়া বুধবারী বাজার। ১৯৫৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি কয়েক দশক ধরে ইসলামি শিক্ষা ও আদর্শ প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এর প্রতিষ্ঠা, বিকাশ এবং বর্তমান অবস্থা এই অঞ্চলের মানুষের ঈমান ও শিক্ষার প্রতি গভীর অনুরাগের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
পটভূমি ও স্বপ্নদ্রষ্টা
সিলেট জেলার গোলাপগঞ্জ থানার অন্তর্গত কুশিয়ারা নদীর তীরে বাগিরঘাট ও কালিজুরী নামক দুটি সবুজ-শ্যামল গ্রামে এই জামেয়ার অবস্থান। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এই অঞ্চলে ইসলামি শিক্ষার একটি প্রদীপ জ্বালানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন এক মনীষী—হাফিজ মুস্তাকিম আলী রাহ.। তিনি ছিলেন পার্শ্ববর্তী পুরুষপাল গ্রামের একজন যোগ্য সন্তান এবং কালিজুরী চৌধুরী বাড়ি জামে মসজিদের তৎকালীন পেশ ইমাম ও খতিব।
তিনি অনুভব করেন যে,সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নতির পাশাপাশি আত্মিক ও নৈতিক উন্নতির জন্য ইসলামি শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। এই চিন্তা থেকেই তিনি একটি দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। কথিত আছে, এক রাতে তিনি স্বপ্নে নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর দেখা পান, যা তার সংকল্পকে আরও দৃঢ় করে। এই স্বপ্ন তাকে এতটাই অনুপ্রাণিত করে যে, তিনি রাতের আঁধারেই তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য বেরিয়ে পড়েন।
ভিত্তি স্থাপন ও পথচলা
হাফিজ মুস্তাকিম আলী তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে শুরু করেন এবং একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তার আন্তরিকতা ও প্রচেষ্টায় সাড়া দিয়ে এলাকার মানুষ তাকে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দেন। তিনি নিজের পৈতৃক জমি বিক্রি করে মাদরাসার জন্য প্রয়োজনীয় নির্মাণসামগ্রী কেনেন এবং ১৯৫৮ সালে বাগিরঘাট ও কালিজুরী গ্রামের মধ্যবর্তী স্থানে একটি টিনশেড ঘর নির্মাণের মাধ্যমে জামেয়ার ভিত্তি স্থাপন করেন।
প্রখ্যাত আলেম ও বুজুর্গ হাফিজ আব্দুল খালিক মাড়কুনী এবং শায়খুল হাদিস হাজী ওয়ারিছ উদ্দীন হাজিপুরী রাহ.-এর মতো ব্যক্তিদের মুবারক হাতে এই প্রতিষ্ঠানের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। প্রথমে হিফজ বিভাগ দিয়ে এর যাত্রা শুরু হয় এবং হাফিজ মুস্তাকিম আলী ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত মাদরাসার মুহতামিম ও শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে হাফিজ আব্দুস সালাম শাহবাগী, হাফিজ জকিগঞ্জী, হাফিজ ময়না মিয়া খাটখাই, হাফিজ তাহির আলী আমুড়ী, হাফিজ ওয়াতির আলী এবং মাওলানা আসহাবুর রহমান জামেয়ার মুহতামিম হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে বনগ্রাম এলাকার মাওলানা আব্দুল বাছির জামেয়ার প্রধান মুহতামিম এবং বাগিরঘাট গ্রামের মাওলানা মুজিবুর রহমান নায়েবে মুহতামিমের দায়িত্ব পালন করছেন।
ক্রমবিকাশ ও দাওরায়ে হাদিসের সূচনা
প্রাথমিকভাবে কেবল হিফজ বিভাগ থাকলেও, এলাকাবাসীর চাহিদার প্রেক্ষিতে ১৯৭৬ সালে হাফিজ ওয়াতির আলীর হাত ধরে প্রাইমারি বিভাগ চালু হয়। ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানটির সুনাম ছড়িয়ে পড়লে ছাত্রসংখ্যা বাড়তে থাকে এবং ১৯৯০-এর দশকে এটিকে মাধ্যমিক স্তরে উন্নীত করা হয়। ১৯৯৮ সালে ফযিলত দ্বিতীয় বর্ষ পর্যন্ত ক্লাস চালু হয়।
জামেয়ার ইতিহাসে একটি মাইলফলক হলো দাওরায়ে হাদিস (মাস্টার্স) বিভাগের সূচনা। প্রখ্যাত শায়খুল হাদিস মাওলানা আব্দুল্লাহ হরীপুরী রাহ.-এর অনুপ্রেরণা এবং যুক্তরাজ্য প্রবাসী আনসারী ভাইদের আর্থিক সহায়তায় তৎকালীন মুহতামিম আল্লাহর উপর ভরসা করে দাওরায়ে হাদিস খোলার প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। ১৯৯৯ সালে বৃহত্তর সিলেটের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস শায়খ ওয়ারিছ উদ্দিন হাজীপুরী রাহ. এবং শায়খুল ইসলাম হুসাইন আহমদ মাদানী রাহ.-এর শাগরিদ শায়খ আব্দুল জলিল রাহ.-এর মাধ্যমে দাওরায়ে হাদিসের উদ্বোধন হয়, যা জামেয়ার অগ্রগতিতে নতুন মাত্রা যোগ করে।
বর্তমান অবস্থা ও শিক্ষাব্যবস্থা
বর্তমানে জামেয়া ইসলামিয়া বুধবারী বাজার একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। এখানে নূরানী ও হিফজ বিভাগ থেকে শুরু করে দাওরায়ে হাদিস (টাইটেল ক্লাস) পর্যন্ত পাঠদান করা হয়। ইসলামি শিক্ষার পাশাপাশি বাংলা, ইংরেজি, গণিত ও বিজ্ঞানসহ আধুনিক বিষয়গুলোও পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত।
এই জামেয়া ‘আযাদ দ্বীনী এদারায়ে তা’লীম বাংলাদেশ বোর্ড’, ‘বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ’ এবং ‘রাবেতাতুল আরাবিয়া বাংলাদেশ বোর্ড’-এর অধীনে পরিচালিত হয়। প্রতি বছর বিভিন্ন পরীক্ষায় এর শিক্ষার্থীরা কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখছে।
আর্থিক সহায়তা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
জামেয়ার আয়ের কোনো নির্দিষ্ট উৎস নেই। দেশ-বিদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের দান, যাকাত ও মৌসুমী চাঁদার ওপর ভিত্তি করেই এর ব্যয় নির্বাহ হয়। বিশেষ করে, “বুধবারী বাজার মাদরাসা ট্রাস্ট ইউ.কে.” নামে যুক্তরাজ্য প্রবাসীদের একটি শক্তিশালী ট্রাস্ট জামেয়ার আর্থিক ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বর্তমানে জামেয়ার অবকাঠামোগত উন্নয়নের কাজ চলছে। ছাত্রদের জন্য পর্যাপ্ত আবাসন ব্যবস্থা, একটি আধুনিক গ্রন্থাগার, কম্পিউটার ল্যাব এবং একটি পুকুরসহ অজু-গোসলের সুব্যবস্থা করার পরিকল্পনা রয়েছে।
উপসংহার
প্রতিষ্ঠার পর থেকে জামেয়া ইসলামিয়া বুধবারী বাজার এই অঞ্চলে ইসলামি শিক্ষার আলো জ্বালিয়ে রেখেছে। শিরক, বিদআতসহ বিভিন্ন ভ্রান্ত মতবাদের বিরুদ্ধে জাতিকে সচেতন করার পাশাপাশি দক্ষ ও যোগ্য আলেম তৈরি করে চলেছে। সমাজের নিরক্ষরতা দূরীকরণ এবং এতিম ও অসহায় শিশুদের ইসলামি শিক্ষায় শিক্ষিত করার ক্ষেত্রেও এর অবদান অনস্বীকার্য। এই জামেয়া শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই নয়, বরং এটি একটি আলোকবর্তিকা যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে।
