জামিয়া ইসলামিয়া মতিনিয়া লুৎফুল উলূম চরবাড়া
জামিয়া ইসলামিয়া মতিনিয়া লুৎফুল উলূম চরবাড়া
ভূমিকা:
ইসলাম ধর্মে জ্ঞানার্জন বা ‘ইলম’ হাসিলকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কুরআনুল কারীমের প্রথম অবতীর্ণ বাণী “ইক্বরা” অর্থাৎ “পড়ো” এর মাধ্যমে জ্ঞান চর্চার যে ঐশী নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, তা-ই মুসলিম সমাজে শিক্ষা ও সংস্কৃতির মূল ভিত্তি স্থাপন করেছে। এই ধারাবাহিকতায়, ইসলামের প্রাথমিক যুগ থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত দ্বীনি শিক্ষা বিস্তারে মাদরাসাগুলো এক অনবদ্য ভূমিকা পালন করে আসছে। দারুল উলূম দেওবন্দের আদর্শকে পাথেয় করে বিশ্বজুড়ে যে লক্ষাধিক ইসলামি শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে উঠেছে, তারই একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলো বাংলাদেশের সুনামগঞ্জ জেলার ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান “জামিয়া ইসলামিয়া মতিনিয়া লুৎফুল উলূম চরবাড়া, ছাতক”।
প্রতিষ্ঠা ও পটভূমি:
১৩৭৭ হিজরির পহেলা জিলক্বদ, যা ১৩৬৪ বঙ্গাব্দের ৭ই জ্যৈষ্ঠ এবং ১৯৫৮ সালের ২১শে মে এই জামিয়া প্রতিষ্ঠিত হয়। শিল্পনগরী ছাতক থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার পশ্চিমে, সুরমা নদীর উত্তর তীরে নোয়ারাই ইউনিয়নের চরবাড়া গ্রামে এর অবস্থান। দারুল উলূম দেওবন্দের চেতনা ও শিক্ষানীতিকে ধারণ করে এই প্রতিষ্ঠানটি তার যাত্রা শুরু করে।
লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য:
প্রতিষ্ঠার সূচনালগ্ন থেকেই জামিয়া কিছু মহৎ লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
* দক্ষ ও যোগ্য আলেম তৈরি করা, যারা হবেন “নায়েবে নবী” বা নবীর প্রতিনিধি।
* শিক্ষার্থীদের ইসলামী রীতিনীতি ও জীবনাচরণে অভ্যস্ত করে তোলা।
* সমাজ ও জাতির সেবা করার জন্য সুযোগ্য আলেম-আলেমা, ক্বারী, হাফেজ, বক্তা এবং লেখক তৈরি করা।
* সাহাবায়ে কেরাম এবং সলফে সালেহীনের আদর্শ, বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিকতার যোগ্য উত্তরাধিকারী তৈরি করা।
* তাবলীগের মাধ্যমে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছে বিশুদ্ধ ইসলামি জ্ঞান পৌঁছে দেওয়া।
* শিশুদের জন্য ইসলামি শিক্ষার আলোকে জীবন গড়ার সুযোগ সৃষ্টি করা।
* বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও জাতীয় স্থিতিশীলতা রক্ষায় ভূমিকা রাখা।
শিক্ষা ব্যবস্থা ও বিভাগসমূহ:
জামিয়া তার শিক্ষার্থীদের জন্য একটি সমন্বিত ও যুগোপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করেছে। এখানে ইসলামি শিক্ষার পাশাপাশি জেনারেল শিক্ষারও সমন্বয় ঘটানো হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটিতে পুরুষ ও মহিলা শাখা রয়েছে।
পুরুষ শাখা: নূরানী, ইবতেদায়ী, মাধ্যমিক এবং তাহফীজুল কুরআন বিভাগ।
মহিলা শাখা: তাহফীজুল কুরআন ও ইবতেদায়ী বিভাগ থেকে শুরু করে দাওরায়ে হাদীস (মাস্টার্স) পর্যন্ত।
২০০৫ সালে (১৪২৬ হিজরি) এলাকাবাসীর সহযোগিতায় এবং মাওলানা হাফিজ শায়খ আব্দুর রব ফয়জীর প্রচেষ্টায় দাওরায়ে হাদীস বিভাগ চালু করা হয়। দারুস সালাম মাদরাসা, খাসদবির, সিলেটের তৎকালীন মুহতামিম ও শায়খুল হাদীস আল্লামা আব্দুল আজীজ দয়ামিরী (রহ.) এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। এই বিভাগে বিভিন্ন সময়ে শায়খুল হাদীস হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন মাওলানা আব্দুল কাইয়ূম লস্কর, মাওলানা এ. এফ. এম. নূরুদ্দিন (রহ.), মাওলানা হাসন আলী, এবং মাওলানা হাফিয আব্দুল জলীল (রহ.)। বর্তমানে শায়খুল হাদীস হিসেবে মাওলানা মুস্তফা কামাল সাহেব এবং সহকারী শায়খুল হাদীস হিসেবে মাওলানা মুহসিন উদ্দিন সাহেব দায়িত্ব পালন করছেন।
অবকাঠামো ও অন্যান্য কার্যক্রম:
গ্রন্থাগার: জামিয়ার গ্রন্থাগারে প্রায় ১৭ শতাধিক বিভিন্ন ধরনের কিতাব রয়েছে যা শিক্ষার্থীদের জ্ঞানার্জনে সহায়তা করে।
আবাসিক ব্যবস্থা: দূরবর্তী শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশে পড়াশোনার লক্ষ্যে আবাসিক বোর্ডিং এর সুব্যবস্থা রয়েছে। বর্তমানে প্রায় ১২৫ জন ছাত্র এখানে থেকে পড়াশুনা করছে, যাদের থাকা-খাওয়া ও চিকিৎসার ভার জামিয়ার “ইমদাদ ফান্ড” থেকে বহন করা হয়।
ফাতওয়া বিভাগ: দৈনন্দিন জীবনে উদ্ভূত বিভিন্ন শরয়ী সমস্যার সমাধানে এই বিভাগ মুসলিম উম্মাহকে সেবা প্রদান করে।
কম্পিউটার প্রশিক্ষণ: আধুনিক যুগের চাহিদা পূরণে শিক্ষার্থীদের জন্য কম্পিউটার প্রশিক্ষণ বিভাগ চালু করা হয়েছে।
ব্যবস্থাপনা ও অর্থায়ন:
জামিয়া তিনটি কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হয়: মজলিসে আমেলা, মজলিসে শুরা এবং মজলিসে আম। এর আর্থিক ব্যবস্থাপনার জন্য চারটি পৃথক ফান্ড রয়েছে: জেনারেল ফান্ড, ইমদাদ ফান্ড, নির্মাণ ফান্ড এবং কিতাব ফান্ড। একটি নির্দিষ্ট দ্বীনি শিক্ষাবোর্ডের নিরীক্ষক দ্বারা এর হিসাব নিরীক্ষা করা হয় এবং বার্ষিক সম্মেলনে তা জনসমক্ষে উপস্থাপন করা হয়।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা:
জামিয়া তার কার্যক্রমকে আরও প্রসারিত করার লক্ষ্যে কিছু ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে:
* শিক্ষার্থীদের স্বাবলম্বী করার জন্য দর্জি বিজ্ঞান বিভাগ চালু করা।
* স্থায়ী আয়ের উৎস হিসেবে একটি মার্কেট নির্মাণ।
* প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ও সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য সীমানা প্রাচীর নির্মাণ।
* বার্ষিক অনুষ্ঠান ও খেলাধুলার জন্য সামনের মাঠ ভরাট করা।
অবদান ও স্বীকৃতি:
প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিগত ৬৫ বছরে জামিয়া ইসলাম ও সমাজের খেদমতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। এই প্রতিষ্ঠান থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ২১০ জন আলেমা ও হাফেজ তৈরি হয়েছে। এছাড়াও, প্রায় ৩৫০ জন আলেম এই জামিয়ায় শিক্ষা গ্রহণ করে পরবর্তীতে উচ্চতর ডিগ্রী অর্জন শেষে দেশে-বিদেশে ইসলামের প্রচার ও প্রসারে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
যে সকল মহান ব্যক্তিরা এই প্রতিষ্ঠানের জন্য জমি দান করেছেন তারা হলেন: সিলেটের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আলহাজ্ব শামসুদ্দীন আহমদ (গেনু মিয়া), ইংল্যান্ড প্রবাসী মোছা. শাফিয়া বেগম, এবং চরবাড়া গ্রামের মরহুম আলহাজ্ব ঈসমাইল আলী সাহেব, আলাউদ্দীন সাহেব (রহ.) ও জনাব মো. মাহবুব মিয়া সাহেব।
উপসংহার:
জামিয়া ইসলামিয়া মতিনিয়া লুৎফুল উলূম চরবাড়া, ছাতক শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই নয়, বরং এটি একটি আলোকবর্তিকা যা গত ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে সুনামগঞ্জ তথা বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে ইসলামি শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে। এর বহুমুখী কার্যক্রম এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাগুলো একে একটি আদর্শ ইসলামি শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা, তিনি যেন এই প্রতিষ্ঠানটিকে উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি দান করেন।
