হযরত শাহচান্দ শাহকালু ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা - Miar Bazar Alia Madrasah
সিলেটের বিশ্বনাথে ঐতিহ্যের মিনার – ‘মিয়ার বাজার ফাজিল মাদ্রাসা’র দ্বীনি পরিক্রমা
সিলেট— বাংলাদেশের আধ্যাত্মিক রাজধানী, দুটি পাতা একটি কুঁড়ির দেশ। এ পুণ্যভূমিতেই শুয়ে আছেন আধ্যাত্মিক সম্রাট হযরত শাহজালাল ইয়ামনি (রহ.) এবং তাঁর সফরসঙ্গী ৩৬০ আউলিয়া। তাঁদেরই পূণ্য স্মৃতি বিজড়িত বিশ্বনাথ উপজেলাধীন দশঘর ইউনিয়নের মিয়ার বাজারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে এক ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি বিদ্যাপীঠ— হযরত শাহচান্দ শাহকালু ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা। স্থানীয়দের কাছে যা ‘মিয়ার বাজার ফাজিল মাদ্রাসা’ নামেই সর্বাধিক পরিচিত।
- অবস্থান: মিয়ার বাজার, বিশ্বনাথ, সিলেট।
- পরিচালনা: ইসলামিক আরবি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড।
- পরিচিতি: এটি মিয়ার বাজার ফাজিল মাদ্রাসা নামেও পরিচিত।
আউলিয়া স্মৃতি ও ভিত্তিপ্রস্তর
ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক মূল্যবোধকে ধারণ করে এই প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করা হয়েছে হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর অন্যতম সফরসঙ্গী হযরত শাহচান্দ ও শাহকালু (রহ.) দ্বয়ের পবিত্র নামে। এলাকার ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের ঐকান্তিক উদ্যোগ ও সার্বিক সহযোগিতায় বিগত ১৯৯৭ ইংরেজী সনের ডিসেম্বর মাসে এক শুভক্ষণে এর প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
এই প্রতিষ্ঠানের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে এটিকে ধন্য করেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত ওলীয়ে কামিল, হাজারো আলেমের উস্তাদ আল্লামা আব্দুল লতিফ চৌধুরী ফুলতলী ছাহেব (রহ.)। তাঁর বরকতময় স্পর্শে প্রতিষ্ঠানটি সূচনালগ্ন থেকেই ইলমে দ্বীনের মশাল জ্বালিয়ে প্রথমে দাখিল, পরবর্তিতে ২০২২ সালে আলিম এবং ২০২৪ সালে ফাজিল উন্নীত হয়ে দ্রুত গতিতে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে শুরু করে।
শিক্ষাঙ্গনের প্রজ্জ্বলিত মশাল
প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত হযরত শাহচান্দ শাহকালু ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা কেবল স্থানীয় গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। এটি ধারাবাহিকভাবে সুনাম কুঁড়িয়ে স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সুপরিচিতি লাভ করেছে। ইলমে দ্বীন শিক্ষার পাশাপাশি সাধারণ ও যুগপোযোগী শিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে এই প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠেছে জ্ঞান চর্চার এক প্রজ্জ্বলিত মশাল।
বর্তমানে এখানে পাঁচটি স্তরে পাঠদানের স্বীকৃতি রয়েছে:
-
ইবতেদায়ী
-
দাখিল
-
আলিম
- ফাজিল
- হিফজ
সুযোগ্য, সুবিজ্ঞ, সুদক্ষ ও বিচক্ষণ শিক্ষক মণ্ডলীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও আন্তরিক পাঠদানের ফলে প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি স্তরে প্রতি বছরই ঈর্ষণীয় ফলাফল অর্জিত হচ্ছে। শুধু একাডেমিক শিক্ষাই নয়, ছাত্র-ছাত্রীদের মেধা ও মনন বিকাশের জন্য এখানে রয়েছে ‘কো কারিকুলাম একটিভিটিস্’ এর সুব্যবস্থা।
কুরআন শিক্ষার অনন্য কেন্দ্র
এই মাদ্রাসার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো পবিত্র কুরআন মজিদ সহীহ্-শুদ্ধ করে পাঠদানের অনন্য বোর্ড ‘দারুল ক্বিরাত মজিদিয়া ফুলতলী ট্রাস্ট’ কর্তৃক অনুমোদিত খামিছ স্তর পর্যন্ত শাখা কেন্দ্র। দক্ষ ক্বারী সাহেবান দ্বারা প্রতি বছর পবিত্র রামাদ্বান মাসে পবিত্র কুরআনের বিশুদ্ধ পাঠের শিক্ষা দেয়া হয়। পাঁচ বছরের শিশু থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত বিনামূল্যে আল-কুরআনুল কারীমের বিশুদ্ধ শিক্ষা গ্রহণ করে নিজেদের জীবনকে আলোকিত করতে পারে।
এছাড়াও, পবিত্র কুরআন মজিদ হিফজ করার জন্য সম্পূর্ণ আধুনিক ও নতুন আঙ্গিকে দক্ষ হাফিজ সাহেবান দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে ‘হিফজুল কুরআন বিভাগ’, যা থেকে প্রতিবছর হাফিজে কুরআন বেরিয়ে আসছেন।
সুবিধাসমূহ ও মানবিক উদ্যোগ
শান্ত-শীতল ও সবুজে ছায়াঘেরা এই বিশাল ক্যাম্পাসে ছাত্র-ছাত্রীদের লেখা-পড়ার জন্য রয়েছে নানা ধরণের সুযোগ-সুবিধা:
-
আবাসিক হোস্টেল: দূরবর্তী ছাত্রদের জন্য মনোরম ও নিরাপদ আবাসিক হোস্টেলের ব্যবস্থা।
-
লাইব্রেরী: বিপুল পরিমাণ কিতাবাদি সম্বলিত একটি সমৃদ্ধ লাইব্রেরী।
-
মসজিদ: ক্যাম্পাসে বিদ্যমান রয়েছে দৃষ্টিনন্দন দু’তলা বিশিষ্ট সুবিশাল একটি মসজিদ।
প্রতিষ্ঠানের মানবিক দিকটি আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে গরীব ছাত্র কল্যাণ ট্রাস্ট। আর্থিকভাবে অসচ্ছল ছাত্র-ছাত্রীদের লেখা-পড়ার পথ সুগম করার লক্ষ্যে দেশ-বিদেশে অবস্থানরত শুভাকাঙ্খীদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও আর্থিক সহায়তায় বহুতল বিশিষ্ট একটি বিশাল ভবন নির্মিত হচ্ছে। এই উদ্যোগ দরিদ্র ছাত্র-ছাত্রীদের পড়া লেখার পথ আরও সুগম করবে বলে আশা করা যায়।
ভবিষ্যতের পথে
ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকা হযরত শাহচান্দ শাহকালু ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা থেকে প্রতি বছর দেশ, সমাজ ও জ্ঞানের সেবায় বেরিয়ে যাচ্ছে ঝাঁকে ঝাঁকে মেধাবীর দল। শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকগণের মধ্যে এক অনন্য মেলবন্ধন বজায় রেখে এই প্রতিষ্ঠানটি সিলেটের ধর্মীয় ও সাধারণ শিক্ষাজগতে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। আগামী দিনে এই বিদ্যাপীঠ আরও উচ্চশিক্ষা (কামিল/মাস্টার্স) স্তরে উন্নীত হয়ে দেশ ও জাতির সেবায় আরও বৃহত্তর পরিসরে অবদান রাখবে— এমনটাই প্রত্যাশা।
