Satpur Kamil Madrasah. সৎপুর দারুল হাদীস কামিল মাদরাসা

Satpur Kamil Madrasah. সৎপুর দারুল হাদীস কামিল মাদরাসা
District: Sylhet
Upazila: Bishwanath

ভূমিকা
সিলেট জেলার বিশ্বনাথ উপজেলার লামাকাজী ইউনিয়নের সৎপুর গ্রামে অবস্থিত সৎপুর দারুল হাদীস কামিল মাদরাসা বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী দ্বীনী বিদ্যাপীঠগুলোর মধ্যে অন্যতম। ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি শুধু একটি মাদারাসা নয়, বরং ইলমে হাদীস চর্চা এবং রুহানী বা আধ্যাত্মিক শিক্ষার এক মিলনকেন্দ্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বর্তমানে এটি ‘ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়’-এর অধীনে কামিল এবং অনার্স পর্যায়ে শিক্ষা প্রদান করছে।

স্বপ্নদ্রষ্টা প্রতিষ্ঠাতা: আল্লামা গোলাম হোসাইন সৎপুরী (রহ.)
এই মাদরাসার প্রতিষ্ঠার ইতিহাস এর স্বপ্নদ্রষ্টা হযরত মাওলানা গোলাম হোসাইন (রহ.)-এর জীবন ও কর্মের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। ১৯২০ সালের ৮ই আগস্ট এক সম্ভ্রান্ত পীর পরিবারে জন্মগ্রহণকারী এই মনীষী ছিলেন প্রখ্যাত পীর জনাব হাসন আলী (রহ.) ও মহীয়সী মাতা খাদিজা বেগম (রহ.)-এর সুযোগ্য সন্তান। সিলেট সরকারি আলিয়া মাদরাসা থেকে ১৯৪৫ সালে কৃতিত্বের সাথে “মুমতাজুল মুহাদ্দিসীন” উপাধি লাভ করার পর তিনি নিজ এলাকার শিক্ষাগত অনগ্রসরতা ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন পরিবেশ দেখে ব্যথিত হন এবং একটি দ্বীনি প্রতিষ্ঠান গড়ার দৃঢ় সংকল্প করেন।
তিনি ছিলেন একজন সত্যিকারের ‘আশেকে রাসূল’, আল্লাহর ওলী, এবং বিনয়ী ব্যক্তিত্ব। আধ্যাত্মিক সাধনার জন্য তিনি প্রথমে কাইমগঞ্জ নিবাসী পীর হামিদ উল্লাহ (রহ.)-এর নিকট বায়াত গ্রহণ করেন এবং তাঁর ইন্তেকালের পর শামসুল উলামা আল্লামা আব্দুল লতিফ চৌধুরী ফুলতলী (রহ.)-এর নিকট বায়াত গ্রহণ করে তরীকতের সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করেন। ১৯৭৫ সালের ১৯শে মার্চ এই মহান মনীষী পরলোকগমন করেন।

প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট ও আধ্যাত্মিক সূচনা
আল্লামা গোলাম হোসাইন (রহ.) ১৯৪৮ সালে নিজ বাড়িতে মাত্র দুজন শিক্ষার্থীকে নিয়ে পাঠদান কার্যক্রম শুরু করেন। তবে প্রতিষ্ঠানটির আনুষ্ঠানিক অগ্রযাত্রার পেছনে ছিল গভীর আধ্যাত্মিক প্রেরণা। স্বীয় মুর্শিদ পীর হামিদ উল্লাহ কাইমগঞ্জী (রহ.)-এর পরামর্শে তিনি ১৯৫২ সালে হজ্জে গমন করেন। সেখানে তিনি মাদরাসা প্রতিষ্ঠার জন্য আধ্যাত্মিক অনুমতি প্রাপ্ত হন।
হজ্জ থেকে ফিরে এসে তিনি উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেম আল্লামা হরমুজ উল্লাহ শায়দা (রহ.)-কে প্রধান অতিথি করে মাদরাসার প্রথম বার্ষিক জলসার আয়োজন করেন। এই সফল আয়োজনের মধ্য দিয়েই মাদরাসার আনুষ্ঠানিক অগ্রযাত্রা শুরু হয়। প্রথমে প্রতিষ্ঠাতার বাড়ি সংলগ্ন ঈদগাহে মাদরাসার কার্যক্রম স্থানান্তরিত হয় এবং এলাকাবাসীর স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতায় এর কলেবর বৃদ্ধি পেতে থাকে।

একাডেমিক স্বীকৃতি ও বিস্ময়কর ক্রমবিকাশ
প্রতিষ্ঠাতার ইখলাস, কঠোর পরিশ্রম এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সাঃ)-এর প্রতি গভীর ভালোবাসার ফলস্বরূপ মাদরাসাটি অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে একাডেমিক স্বীকৃতির প্রতিটি ধাপ অতিক্রম করে।

  • ১৯৫৮ সাল: দাখিল স্তরের মঞ্জুরী লাভ।
  • ১৯৬০ সাল: আলিম স্তরের মঞ্জুরী লাভ।
  • ১৯৬২ সাল: ফাযিল স্তরের মঞ্জুরী লাভ।
  • ১৯৬৫ সাল: মাদরাসা শিক্ষার সর্বোচ্চ স্তর কামিল (হাদীস) পর্যায়ে উন্নীত হয়।

তৎকালীন সময়ে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে মাত্র দুটি কামিল মাদরাসা ছিল, যার মধ্যে সৎপুর অন্যতম। মাদরাসার স্তরভিত্তিক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় অখণ্ড জমিও প্রতিষ্ঠাতা নিজে দান করেন।

সহযোগী মনীষী ও পৃষ্ঠপোষকতা
এই মহৎ কর্মযজ্ঞে আল্লামা গোলাম হোসাইন (রহ.) একা ছিলেন না। তাঁর পাশে থেকে যারা প্রত্যক্ষ সহযোগিতা, দোয়া ও পরামর্শ দিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন:

  • আধ্যাত্মিক রাহবার পীর হামিদ উল্লাহ কাইমগঞ্জী (রহ.)
  • আল্লামা আব্দুল লতিফ চৌধুরী ফুলতলী (রহ.)
  • হাদিস বিশারদ আল্লামা হরমুজ উল্লাহ শায়দা (রহ.)
  • প্রতিষ্ঠাতার সহোদর পীর গোলাম হাফিজ (রহ.)
  • তৎকালীন মন্ত্রী জনাব দেওয়ান মোঃ আব্দুল বাছিত
  • মৌলভী মো. আব্দুল মালিক সুফী ও ইসহাক আহমদ

এই তিন ওলীর আধ্যাত্মিক অবদানের প্রতি ইঙ্গিত করে মাদরাসার সাবেক অধ্যক্ষ মাওলানা হবিবুর রহমান (রহ.) একটি উর্দু কবিতা রচনা করেছিলেন, যার প্রথম দুটি চরণ ছিল:
“ইয়ে গুলামী বাগ হো – ওর হামিদী গুলযার হো / ইয়ে লতিফী ফায়েয কা এক – খুশমনা দরবার হো”।
(অর্থ: এই বাগানটি গোলামের হোক, আর হামিদীর ফুলের হোক / এটি লতিফী ফয়েজের এক মনোরম দরবার হোক)।

আধুনিকায়ন ও বর্তমান অবকাঠামো
সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে মাদরাসাটি আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় প্রবেশ করেছে।

  • অনার্স কোর্স: ২০১৭ সালে ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে “আল-হাদিস এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ” বিষয়ে অনার্স কোর্স চালু হয়।
  • অবকাঠামো: বর্তমানে মাদরাসার মোট জমির পরিমাণ ৪.৩৮ একর, যার মধ্যে ১.৬৫ একর জমির উপর ক্যাম্পাস অবস্থিত। এখানে ৩টি একাডেমিক ভবন, ১টি প্রশাসনিক ভবন এবং ১টি ছাত্রাবাসসহ মোট ৫টি ভবন রয়েছে।
  • গ্রন্থাগার: মাদরাসায় একটি সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার রয়েছে যেখানে তাফসীর, হাদীস, ফিকহ, মুক্তিযুদ্ধসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রায় ছয় হাজারেরও অধিক গ্রন্থ সংরক্ষিত আছে।
  • সহযোগী প্রতিষ্ঠান: শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে “আল-হুসাইন একাডেমি” নামে একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান এবং মেধা বিকাশের জন্য “হুসাইনিয়া ছাত্র সংসদ” সক্রিয় রয়েছে।

প্রতিষ্ঠাতার দোয়া ও ভবিষ্যদ্বাণী
আল্লামা গোলাম হোসাইন (রহ.) তাঁর মাদরাসার প্রতি অত্যন্ত আশাবাদী ছিলেন। ১৯৭৫ সালে তাঁর শেষ বার্ষিক জলসায় তিনি বলেছিলেন:
“এ মাদরাসার মঞ্জুরী মদিনা শরীফ থেকে আনা হয়েছে। এর ক্ষতি যে করবে আল্লাহ তার ক্ষতি করবেন।”
তিনি আরও দোয়া করেছিলেন, “ইমাম মাহদী (আ.) এসে এ মাদরাসা দেখে যেন খুশী হন।”

উপসংহার
দুজন ছাত্র নিয়ে যে প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়েছিল, আজ তা দেড় হাজারের অধিক শিক্ষার্থীর পদচারণায় মুখরিত এক বিশাল জ্ঞানকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। হযরত মাওলানা গোলাম হোসাইন (রহ.)-এর রোপণ করা এই জ্ঞানবৃক্ষ থেকে হাজারো আলেম, মুহাদ্দিস ও ইসলামি চিন্তাবিদ তৈরি হয়ে দেশ-বিদেশে দ্বীনের খিদমত আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছেন। এটি শুধু একটি মাদראਸাই নয়, বরং একটি জীবন্ত ইতিহাস ও আধ্যাত্মিক প্রেরণার উৎস।

Sign In

Register

Reset Password

Please enter your username or email address, you will receive a link to create a new password via email.