জামিয়া ইসলামিয়া হুসাইনিয়া গহরপুর। Jamia Islamia Husainia Gohorpur.
শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড এবং সমাজ বিনির্মাণের চাবিকাঠি। এই মহান ব্রতকে সামনে রেখে বাংলাদেশের আধ্যাত্মিক রাজধানী পূণ্যভূমি সিলেটে যে ক’টি প্রতিষ্ঠান ইসলামি শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে, তার মধ্যে অন্যতম ‘জামিয়া ইসলামিয়া হুসাইনিয়া গহরপুর’। যা সংক্ষেপে ‘গহরপুর জামিয়া’ নামে সুপরিচিত। ১৯৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ঐতিহ্যবাহী কওমি মাদ্রাসাটি শুধু একটি শিক্ষালয়ই নয়, বরং এটি ইসলামি শিক্ষা, আধ্যাত্মিকতা, সমাজ সংস্কার এবং বৃহত্তর অর্থে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থার পথপ্রদর্শক। সিলেট জেলার বালাগঞ্জ উপজেলার গহরপুর এলাকায়, বড়বাঘা নদীর তীরে এক মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে অবস্থিত এই প্রতিষ্ঠানটি আজ তার কর্মপরিধি এবং প্রভাবের কারণে জাতীয় পর্যায়ে একটি অনুকরণীয় নাম।
প্রতিষ্ঠার ইতিহাস ও প্রেক্ষাপট
উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামি শিক্ষা ও সংস্কৃতির যে পুনর্জাগরণ ঘটেছিল, তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশেও অসংখ্য দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। গহরপুর এবং এর আশপাশের অঞ্চলে উচ্চতর ইসলামি শিক্ষার তীব্র অভাব অনুভূত হচ্ছিল। দ্বীনি জ্ঞানার্জনের জন্য শিক্ষার্থীদের দূর-দূরান্তে পাড়ি জমাতে হতো। এই শূন্যতা পূরণের লক্ষ্যে উপমহাদেশের বরেণ্য বুজুর্গ, শাইখুল হাদিস আল্লামা হাফিজ নূরুদ্দীন আহমদ (গহরপুরী রহ.) এক ঐতিহাসিক উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তিনি এলাকাবাসীর আন্তরিক সহযোগিতায় এবং সীমাহীন ইখলাস ও লিল্লাহিয়াতের সাথে ১৯৫৭ সালে এই জামিয়া প্রতিষ্ঠা করেন।
প্রতিষ্ঠাতা আল্লামা গহরপুরী (রহ.)-এর দূরদর্শী চিন্তা ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ফল ছিল অভূতপূর্ব। প্রতিষ্ঠার মাত্র এক বছরের মাথায়, ১৯৫৮ সালেই, জামিয়ায় ইসলামি শিক্ষার সর্বোচ্চ স্তর “দাওরায়ে হাদিস” (মাস্টার্স সমমান) বিভাগ চালু করা হয়, যা প্রতিষ্ঠানটির দ্রুত অগ্রগতি ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও আদর্শ
জামিয়া ইসলামিয়া হুসাইনিয়া গহরপুর মূলত আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আদর্শভিত্তিক এবং দারুল উলুম দেওবন্দের মূলনীতিতে পরিচালিত একটি দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
যোগ্য আলেম তৈরি:
নিয়মতান্ত্রিক শিক্ষা (তা’লীম) ও আধ্যাত্মিক প্রশিক্ষণ (তারবিয়াত)-এর মাধ্যমে হক্কানী আলেম তৈরি করা, যারা দেশ ও জাতির খেদমতে নিজেদের উৎসর্গ করবেন।
-
দ্বীনের সংরক্ষণ ও প্রচার: কুরআন-সুন্নাহর সঠিক শিক্ষা ও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদার সংরক্ষণ এবং হানাফী ফিকহের যথাযথ বাস্তবায়ন করা।
-
সমাজ সংস্কার: ইসলাম বিরোধী মতবাদ, শিরক, কুফর, বিদআত ও যাবতীয় পাপাচারের মূলোৎপাটন করে “আমর বিল মা’রুফ ও নাহি আনিল মুনকার” (সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ)-এর মাধ্যমে সমাজে ন্যায়-নীতি ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা।
শিক্ষা ব্যবস্থা ও পাঠ্যক্রম
গহরপুর জামিয়া একটি গতানুগতিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়। এর শিক্ষাধারা ও পাঠ্যক্রম অত্যন্ত সুবিন্যস্ত এবং সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার ফসল। প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড ‘বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ’-এর অধীনে পরিচালিত হয়।
বিভাগসমূহ:জামিয়ার শিক্ষা কার্যক্রম বিভিন্ন বিভাগে বিভক্ত, যা একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামি বিদ্যাপীঠের কাঠামোকে প্রতিফলিত করে:
- ১. কিতাব বিভাগ: এটি জামিয়ার প্রধান ও বৃহত্তম বিভাগ। এখানে একজন শিক্ষার্থীকে মোট ১৪ বছরের দীর্ঘ শিক্ষা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যোগ্য আলেম হিসেবে গড়ে তোলা হয়। এই বিভাগটি পাঁচটি স্তরে বিভক্ত:
* ইবতেদাইয়্যাহ (প্রাথমিক)
* মুতাওয়াসসিতাহ (মাধ্যমিক)
* সানুবিয়্যাহ উলয়া (উচ্চ মাধ্যমিক)
* ফযীলত (ডিগ্রি সমমান)
* তাকমিল বা দাওরায়ে হাদিস (মাস্টার্স সমমান) - ২. হিফজুল কুরআন বিভাগ: যে সকল শিক্ষার্থী কুরআন শরীফ দেখে শুদ্ধভাবে পড়তে সক্ষম, তাদেরকে এই বিভাগে অত্যন্ত যত্ন সহকারে স্বল্প সময়ে সম্পূর্ণ কুরআন মুখস্থ করানো হয়।
৩. ইফতা কোর্স (উচ্চতর গবেষণা): দাওরায়ে হাদিস সম্পন্নকারী মেধাবী আলেমদের জন্য এটি একটি বিশেষায়িত গবেষণা বিভাগ। এখানে শিক্ষার্থীদেরকে ইসলামি আইনশাস্ত্র বা ফিকহে পারদর্শী এবং যুগ-সচেতন মুফতি হিসেবে গড়ে তোলা হয়, যেন তারা উদ্ভূত নতুন সমস্যার শরয়ী সমাধান দিতে পারেন।
পাঠ্যসূচি:
জামিয়ার সিলেবাসে মৌলিকভাবে কুরআন, হাদিস, ফিকহ, তাফসির, উসূল ও আকাইদের মতো প্রধান বিষয়গুলোর উপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি আরবি সাহিত্য, নাহু (বাক্যরীতি), সরফ (শব্দতত্ত্ব), বালাগাত (অলংকারশাস্ত্র) এবং বৈষয়িক পর্যায়ে বাংলা, ইংরেজি, গণিত, ইতিহাস ও ভূগোলের মতো বিষয়গুলোও প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষা দেওয়া হয়, যাতে আলেমগণ সমকালীন বিশ্ব সম্পর্কে অবগত থাকতে পারেন।
সহশিক্ষা ও ছাত্র প্রশিক্ষণ কার্যক্রম
পুথিগত বিদ্যার পাশাপাশি ছাত্রদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশ ও তাদেরকে সামাজিক নেতৃত্বদানের যোগ্য করে গড়ে তোলার জন্য জামিয়াতে রয়েছে বহুমুখী আয়োজন। মেধাবী ছাত্রদের নিয়ে গঠিত ছাত্র সংসদ “আননূর ছাত্র কাফেলা” এই কার্যক্রমগুলো পরিচালনা করে:
-
ছাত্র পাঠাগার: সিলেবাসভুক্ত বইয়ের বাইরেও ছাত্রদের জ্ঞানের পরিধি বিস্তৃত করার লক্ষ্যে একটি সমৃদ্ধ পাঠাগার রয়েছে, যেখানে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও সমকালীন বিষয়ে তথ্যবহুল বই-পুস্তক রয়েছে।
-
বক্তৃতা ও লেখনী প্রশিক্ষণ: অর্জিত জ্ঞানকে সুন্দর ও সাবলীল ভাষায় সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য সাপ্তাহিক, মাসিক ও বার্ষিক বক্তৃতা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। পাশাপাশি, ছাত্রদেরকে কলম সৈনিক হিসেবে গড়ে তুলতে নিয়মিত দেয়ালিকাও প্রকাশ করা হয়।
-
হামদ-নাত ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম: আল্লাহ ও রাসূলপ্রেমের সুর ছড়িয়ে দিতে এবং শিক্ষার্থীদের সুস্থ প্রতিভা বিকাশের সুযোগ করে দিতে “আননূর সাংস্কৃতিক কাফেলা” গঠন করা হয়েছে।
-
দাওয়াত ও তাবলীগ: প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি আত্মশুদ্ধি ও দ্বীনের দাওয়াত সর্বত্র পৌঁছে দেওয়ার জন্য শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে সাপ্তাহিক ২৪ ঘণ্টার জন্য তাবলীগী জামাত পাঠানো হয়।
সামাজিক সেবা ও অবদান
গহরপুর জামিয়া কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই নয়, এটি একটি সামাজিক সেবা কেন্দ্রও বটে। এর বিভিন্ন সেবা প্রকল্পের মাধ্যমে জামিয়া বৃহত্তর समाजाभिमुख ভূমিকা পালন করে:
-
ফতওয়া বিভাগ: ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক বা ধর্মীয়—যেকোনো জটিল বিষয়ে দক্ষ মুফতিগণ এই বিভাগ থেকে ইসলামি সমাধান প্রদান করেন।
-
ফরায়েজ বিভাগ: মৃত ব্যক্তির স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ওয়ারিশদের মধ্যে শরিয়ত মোতাবেক সুষ্ঠুভাবে বণ্টনের রূপরেখা এই বিভাগ থেকে প্রদান করা হয়।
প্রতিষ্ঠানটি থেকে শিক্ষা সম্পন্ন করা হাজারো আলেম আজ দেশ ও বিদেশে মসজিদ-মাদ্রাসায় শিক্ষকতা, ইমামতি, ওয়াজ-নসিহত ও মানবকল্যাণমূলক কাজে নিয়োজিত থেকে সমাজ গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন, যা এই জামিয়ার সামাজিক দায়বদ্ধতা ও অবদানের সুস্পষ্ট প্রমাণ।
