Jamea Madania Islamia Kazir Bazar,Sylhet. জামেয়া মাদানিয়া ইসলামিয়া, কাজির বাজার, সিলেট
প্রতিষ্ঠাতা ও প্রারম্ভিক পটভূমি
জামেয়া মাদানিয়া ইসলামিয়া, কাজির বাজার, সিলেটের প্রতিষ্ঠা বাংলাদেশের ধর্মীয় ও আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত। প্রতিষ্ঠানটি ১৯৭৪ সালের ৫ জুন প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও আলেম প্রিন্সিপাল হাবীবুর রহমান (রহঃ)-এর দূরদর্শী উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রিন্সিপাল হাবীবুর রহমান রহ. ছিলেন সিলেটের একজন প্রকাশিত আলেম এবং পরবর্তীকালে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
স্বাধীনতা-উত্তর টালমাটাল বাংলাদেশে যখন নতুন করে জাতি গঠনের কাজ চলছিল, তখন তিনি উপলব্ধি করেন যে, দেশের মানুষকে কেবল ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুললেই চলবে না, বরং আধুনিক শিক্ষায়ও পারদর্শী করে তুলতে হবে। এই দূরদর্শী চিন্তা থেকেই তিনি ইসলামী শিক্ষার মূলধারার সঙ্গে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই তিনি সিলেটের সুরমা নদীর তীরে এক ছোট ডালিম গাছের নিচে মাদ্রাসাটির ভিত্তি স্থাপন করেন।
প্রতিষ্ঠা ও বিকাশ
প্রাথমিকভাবে জামেয়ার পথচলা ছিল অত্যন্ত সাদামাটা। বাঁশ-বেত ও টিনের কুঁড়ে ঘরে মাত্র কয়েকজন ছাত্র-ছাত্রী নিয়ে প্রাথমিক ও হিফজ (কুরআন মুখস্থ) বিভাগ চালু করা হয়। শিক্ষকের সংখ্যা এবং সুযোগ-সুবিধা ছিল সীমিত, কিন্তু প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল হাবীবুর রহমান (রহঃ)-এর একাগ্রতা ও স্থানীয়দের সহায়তায় প্রতিষ্ঠানটি দ্রুতই পরিচিতি লাভ করতে শুরু করে এবং ছাত্রসংখ্যা বাড়তে থাকে।
এই ক্রমবর্ধমান চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে, ১৯৭৯ সালে জামেয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক অতিক্রম করে। সিলেট পৌরসভা কর্তৃক দানকৃত এক একর জমিতে মাদ্রাসাটিকে বর্তমান ভি.আই.পি রোড, কাজির বাজার-এর স্থায়ী স্থানে স্থানান্তর করা হয়। এই স্থায়ী স্থানটি জামেয়ার অবকাঠামো ও একাডেমিক কার্যক্রমের সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
একাডেমিক আদর্শ ও সংস্কার
প্রতিষ্ঠার পর থেকেই জামেয়া মাদানিয়া ইসলামিয়া একটি পূর্ণাঙ্গ কওমি মাদ্রাসা হিসেবে দারুল উলুম দেওবন্দের মৌলিক শিক্ষাদর্শ ও মূলনীতি অনুসরণ করে আসছে। তবে একই সঙ্গে এটি অন্যান্য কওমি প্রতিষ্ঠানের তুলনায় কিছু ব্যতিক্রমী ও আধুনিক সংস্কারমূলক কার্যক্রম চালু করে। এদের মধ্যে অন্যতম ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে ছাত্র সংসদ প্রতিষ্ঠা। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ছাত্রদের সাংগঠনিক দক্ষতা বৃদ্ধি ও গণতান্ত্রিক চর্চার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়, যা কওমি অঙ্গনে একটি বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
জামেয়া তার পাঠ্যক্রমে শুরু থেকেই ইসলামী ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয় ঘটিয়েছে। এটি কেবল ধর্মীয় শিক্ষা (যেমন: দাওরায়ে হাদিস ও মুফতী কোর্স) প্রদান করেই ক্ষান্ত হয়নি, বরং প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যম, গণিত, বিজ্ঞান, কম্পিউটার ও কারিগরি বিষয়াদির পাঠদান নিশ্চিত করেছে।
বর্তমান কাঠামো ও স্বীকৃতি
বর্তমানে জামেয়া মাদানিয়া ইসলামিয়া একটি বৃহৎ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে সুপরিচিত। এটি দেশের শীর্ষস্থানীয় কওমি শিক্ষা বোর্ড আল-হাইআতুল উলয়া লিল জামিআতিল কওমিয়া (বাংলাদেশ) কর্তৃক অনুমোদিত এবং বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ-এর অন্তর্ভুক্ত।
এখানে উল্লেখযোগ্য শিক্ষাবিভাগগুলো হলো:
- আধুনিক নূরানী পদ্ধতিতে প্রাথমিক শিক্ষা
- হিফজুল কুরআন বিভাগ
- মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত আধুনিক শিক্ষা
- দাওরায়ে হাদিস (তাকমীল ফিল হাদিস): মাস্টার্স পর্যায়ের ইসলাম ধর্মীয় শিক্ষা
- মুফতী কোর্স: (ইজতিহাদ-সম্পন্ন আলেম তৈরির কোর্স)
- আল-জামেয়া কুরআন প্রশিক্ষণ কোর্স: (সম্পূর্ণ তাজভীদসহ কুরআন শিক্ষা)
উপসংহার
জামেয়া মাদানিয়া ইসলামিয়া, কাজির বাজার, সিলেট মাওলানা হাবীবুর রহমান (রহঃ)-এর দূরদর্শী স্বপ্নের বাস্তবায়ন। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এটি শুধু একটি ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবেই নয়, বরং ধর্মীয় শিক্ষার সঙ্গে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের সমন্বয়কারী একটি মডেল প্রতিষ্ঠান হিসেবেও পরিচিতি লাভ করেছে। এটি যুগোপযোগী সিলেবাস প্রণয়ন ও সংস্কারমূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশের শিক্ষা ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে।
